বাংলাদেশে এ বছর হাম ও এর উপসর্গ এক ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে বাংলাদেশে। বিগত বছরগুলোতে এই রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকলেও, টিকাদানের ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারণী অবহেলার কারণে বর্তমানে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে।
সংক্রমণ ও মৃত্যুর বৈশ্বিক ও দেশীয় পরিসংখ্যান
ডব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম ও হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে, যা বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই তালিকায় বাংলাদেশের পরে যথাক্রমে ভারত (২৬,৬০৭) এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের (১৪,৫২১) অবস্থান। এর আগের একটি প্রতিবেদনে (নভেম্বর ২০২৫ – এপ্রিল ২০২৬) ভারত শীর্ষে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ শীর্ষে উঠে আসে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে ২১ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৭০৮ জন। এই সময়ে নিশ্চিত হামে ৯৫টি শিশুসহ মোট ৭৯৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, দ্য ডেইলি স্টারের ১৮ জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হামের উপসর্গে সিলেট ও ঢাকায় আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, বাংলাদেশ সংক্রমণের দিক থেকে তো বটেই, হামে মৃত্যুর দিক থেকেও সম্ভবত বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।

টিকাদানে ঘাটতি ও ‘ইমিউনিটি গ্যাপ‘
বিশেষজ্ঞরা এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে মূলত ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা টিকাদানের ঘাটতিকে দায়ী করছেন। ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি এবং এক বছরের কম বয়সী আক্রান্ত প্রায় ৫ হাজার শিশুর মধ্যে ৪ হাজারের বেশি শিশুই টিকার একটি ডোজও পায়নি।
একসময় টিকাদানে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও, ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজ কমে ৫৯ শতাংশে নেমে আসে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতা দেখা দেয়। এর আগে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে হামের রোগী ছিল যথাক্রমে ৩১১, ২৮২, ২৪৭ এবং ১৩২ জন। কিন্তু এ বছর মার্চ মাসেই রোগীর সংখ্যা ৫ হাজারে এবং এপ্রিলে তা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
সতর্কবার্তা উপেক্ষা ও নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা
এই সংকটের পূর্বাভাস আগেই দিয়েছিল জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফ। ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে, ইউনিসেফ ভ্যাকসিন সরবরাহে বিলম্ব ও প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে বারবার সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তায় তখন মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে বর্তমান সরকার গত এপ্রিলে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করলেও, হিসাবের গরমিলের কারণে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে যায়, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জানিয়েছেন, হার্ড ইমিউনিটি এক দিনে তৈরি হয় না, আবার ভাঙেও না। কিন্তু টানা দুই বছর প্রয়োজনীয় কভারেজ না থাকার কারণে যে বিশাল ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, তার ফলে ভবিষ্যতেও দেশে হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের মতো সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছে যে, কভারেজের বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে না পারলে এই ঝুঁকি পুরোপুরি কাটবে না।