দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে বড় ধরনের আর্থিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকে এই কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে একক পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন খাতের রপ্তানি প্রসারে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, পাটজাত সামগ্রী এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধে সম্পূর্ণ অটোমেটেড ডিজিটাল কর ব্যবস্থা দ্রুত চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করাই এই সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য।
বৈঠকে রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে পণ্য খালাসের সময়সীমা কমিয়ে আনার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের অপ্রয়োজনীয় ডেমারেজ ও লজিস্টিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সহজ শর্তে চলতি মূলধন ঋণ সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন অর্জনে দেশীয় কারখানাগুলোকে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে। এর জন্য একটি বিশেষ সরকারি তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনাও চলমান রয়েছে।
এদিকে রাজস্ব আদায়ে বিদ্যমান ফাঁকফোকর বন্ধে বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল অডিট আনা হচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যান জানান যে করদাতাদের হয়রানি বন্ধ করতে সশরীরে উপস্থিতি বাতিল করা হবে। শতভাগ ই-রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাধারণ চাকরিজীবীদের কর প্রদানে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অপ্রয়োজনীয় শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা তুলে নেওয়া হচ্ছে। পরোক্ষ করের বোঝা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর নিত্যপণ্যের বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারের এই দ্বিমুখী সংস্কার উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন যে সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এই পদক্ষেপ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ শর্ত বাস্তবায়নেও এই আর্থিক শৃঙ্খলা জরুরি। অর্থ পাচার রোধ এবং ব্যাংকিং খাতের অনাদায়ী ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে。
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই প্রধান জাতীয় লক্ষ্য। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি পেলে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনে সহায়ক পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর। আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই সংস্কার কার্যক্রমের দৃশ্যমান অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও চেম্বার প্রতিনিধিরা এই সংস্কার কার্যক্রমকে সফল করতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
হাইলাইটস:
- রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকারের সমন্বিত কঠোর আর্থিক সংস্কার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
- পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশেষ প্রণোদনা ও ডিজিটাল লজিস্টিক সহায়তার ঘোষণা।
- কর ফাঁকি রোধ ও করদাতা হয়রানি বন্ধে শতভাগ ডিজিটাল ই-রিটার্ন এবং স্বয়ংক্রিয় অডিট ব্যবস্থার বিস্তার।