Home » বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো মানসিক শক্তি

বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো মানসিক শক্তি

কর্তৃক Towkir Hasan
০ মন্তব্য
বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো মানসিক শক্তি

পদার্থবিজ্ঞান সাক্ষাৎকার বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো মানসিক শক্তি ভারতের নামী তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অশোক সেন। সম্প্রতি প্রথম ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানী হিসেবে পেয়েছেন অস্কার ক্লেন মেডেল। এর আগে এই পুরস্কার পেয়েছেন স্টিফেন হকিং, পিটার হিগসের মতো বহু কিংবদন্তি বিজ্ঞানসাধকেরা। অশোক সেন বর্তমানে টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল সায়েন্সেসে কর্মরত।

তিনি ১৯৫৬ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে করেন স্নাতক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেছেন ফার্মিল্যাবে ও স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার এক্সেলেটর কেন্দ্রে। ভারতে ফিরে প্রথমে যোগ দেন টাটা ইনস্টিটিউটে। এরপর এলাহাবাদ হরিশ্চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটে গবেষণা করছেন তিনি। ড. সেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও স্ট্রিংতত্ত্ববিদ হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। স্ট্রিং থিওরির বিস্তারিত ব্যাখ্যার পাশাপাশি কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি–সম্পর্কিত নানা জটিল সমস্যার সমাধান করেছেন তিনি। পেয়েছেন পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সেরা পুরস্কার ‘ফান্ডামেন্টাল ফিজিকস পুরস্কার’। ভারত সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে ভূষিত এই বাঙালি বিজ্ঞানী রয়্যাল সোসাইটির সদস্য। এ ছাড়া ২০১৪ সালে অত্যন্ত সম্মানিত ডিরাক মেডেলও পান এই তাত্ত্বিক পদার্থবিদ।

২০১৯ সালে হাই এনার্জি ফিজিকস–বিষয়ক বিশেষ এক আয়োজনে বাংলাদেশে এসেছিলেন এই বিজ্ঞানী। সে সময় ছেলেবেলা, দেশে বিজ্ঞানচর্চা আর সামনের দিনগুলোর পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে। এই আলাপচারিতায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আরশাদ মোমেন, বিজ্ঞানচিন্তা র নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার এবং সাবেক সহসম্পাদক আবদুল গাফফার ।

বিজ্ঞানচিন্তা : শুরুতেই আপনার শৈশব, কৈশোর ও লেখাপড়া সম্পর্কে জানতে চাই। আপনার ছেলেবেলা সম্পর্কে কিছু বলুন।

অশোক সেন: উত্তর কলকাতায় জন্ম আমার। সেখানেই বড় হয়েছি। বিএসসি পর্যন্ত আমার শিক্ষাজীবন কলকাতাতেই কেটেছে। শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয় নামে এক বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনার হাতেখড়ি। খুব উন্নত মানের না হলেও লেখাপড়ার মান সেটার খুব খারাপও ছিল না। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে আমি বেশ কয়েকজন ভালো শিক্ষক পেয়েছিলাম। অমল রায় চৌধুরী, বিখ্যাত রায়চৌধুরী সমীকরণের জনক—সরাসরি আমার শিক্ষক ছিলেন। থার্মোডায়নামিকস পড়াতেন তিনি। আমি যে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে উঠি, এর পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল। আমাদের ব্যাচে সবাই খুব আগ্রহী ছিল পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে। স্নাতকের পর কানপুরের আইআইটিতে পড়তে যাই। ওখানে মাস্টার্স করি পদার্থবিদ্যায়। তারপর তো যুক্তরাষ্টে পাড়ি দিই। স্টোনি ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করি।

অশোক সেন: বর্তমানে এলাহাবাদের হরিশ্চন্দ্র রিসার্চ সেন্টারে গবেষণা করছি (*২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা)। স্ট্রিং থিওরি নিয়ে। স্ট্রিংতত্ত্বের তো অনেকগুলো ক্ষেত্র আছে, এগুলোর বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রেই আমার কাজ। ব্ল্যাকহোলে স্ট্রিংতত্ত্ব প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটা নিয়ে আমি কাজ করেছি। আরও নানা রকম মৌলিক হিসাব-নিকাশ নিয়েও কাজ করে যাচ্ছি। স্ট্রিং থিওরি নিয়ে বহুদিন ধরে কাজ চলছে। কিন্তু এখনো অনেক ফাঁক রয়ে গেছে এই তত্ত্বে। আমি সেই ফাঁকফোকরগুলো পূরণের চেষ্টা করছি। তবে আমার মূল আকর্ষণ স্ট্রিং ডুয়েলিটি নিয়ে। একই ফিজিক্যাল তত্ত্বকে স্ট্রিং থিওরির বিভিন্ন বর্ণনায় কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, সেটাই আসলে স্ট্রিং ডুয়েলিটির মূল কাজ। এগুলো নিয়েই আমার গবেষণা।

আপনার পিএইচডি ছিল সবল নিউক্লীয় বল নিয়ে। সেখান থেকে কেন আপনি স্ট্রিং তত্ত্বের দিকে ঝুঁকলেন?

অশোক সেন: শুরুতে আমার মূল আকর্ষণ ছিল হাই এনার্জি ফিজিকস নিয়ে। সে জন্য পোস্ট ডক্টরাল করতে যাই যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মিল্যাবে। হাই এনার্জি ফিজিকসের অনেকগুলো বিষয় নিয়ে কাজ করতে শুরু করি। তখন জন শোয়ার্জের একটা ফিজিকস রিপোর্ট আমার হাতে আসে। সেটা পড়তে শুরু করি। স্ট্রিং থিওরির পাইওনিয়ারদের একজন তিনি। সেই রিপোর্ট পড়তে গিয়েই স্ট্রিং থিওরি আকর্ষণ করে আমাকে। এর কিছুদিন পর এডওয়ার্ড উইটেনের স্ট্রিং তত্ত্বের একটা সেমিনারে গিয়েছিলাম। তারপর মাইকেল গ্রিন আর জন শোয়ার্জের স্ট্রিং তত্ত্ব সাড়া ফেলে দেয়। এসব ঘটনাই আমাকে স্ট্রিং তত্ত্বের প্রতি আগ্রহী করে।

অশোক সেন: শুধু আমিই নই। আমার সঙ্গে আরও আটজন পেয়েছিল এই পুরস্কার। হ্যাঁ, আমরাই প্রথম এই পুরস্কার পেয়েছি।

বিজ্ঞানচিন্তার বেশির ভাগ পাঠক কিশোর-তরুণ। তাদের জন্য সহজ ভাষায় স্ট্রিং থিওরি বুঝিয়ে বলুন।

অশোক সেন: এটা বোঝার জন্য আগে পদার্থবিজ্ঞানের একটা দুর্বলতার কথা জানতে হবে। সেটা হলো মহাকর্ষ বলের সঙ্গে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার বৈরিতা। সবল নিউক্লীয়, দুর্বল নিউক্লীয় কিংবা বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় বলকে কোয়ান্টাম মেকানিকস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু মহাকর্ষ বলকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কোয়ান্টাম তত্ত্বের মূল কথা হলো, প্রকৃতির উপাদানগুলো ভাঙলে একসময় মূল কণিকাগুলো পাওয়া যায়। কিন্তু স্ট্রিং থিওরি বলে, এই মূল কণাগুলোও আসলে একধরনের তন্তু বা সুতার কম্পন। সেই সুতা বা স্ট্রিংগুলোর বিভিন্ন মোডে কম্পনের কারণেই সেগুলোকে কণা হিসেবে আমরা দেখি। এটা শুধু একটা গাণিতিক চিন্তা থেকে শুরু হয়েছিল। তখন অবশ্য মহাকর্ষের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথা কেউই ভাবেনি।

পরে দেখা গেল, স্ট্রিং থিওরিতে একটা মৌলিক কণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসছে, সেটা ঠিক মহাকর্ষের মতো আচরণ করে। সেই কণাটা কোয়ান্টায়িত। অর্থাৎ কোয়ান্টাম মহাকর্ষের একটা তত্ত্ব পাওয়া গেল স্ট্রিং থিওরি থেকে। এটা আসলে পেনিসিলিন আবিষ্কারের মতো অপ্রত্যাশিত এক আবিষ্কার। সেখান থেকে স্ট্রিং থিওরির পথচলা শুরু হয়। এর মূল অংশে আছে গেজ থিওরি। অনেকে মনে করে, ভবিষ্যতে সব শক্তিকেই এই স্ট্রিং থিওরি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে। কিন্তু সেটা এখনো সম্ভব হয়নি। এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে।

স্ট্রিং থিওরির পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তাই অনেকে বলেন, এর টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

অশোক সেন: মৌলিকভাবে স্ট্রিং থিওরির কিন্তু প্রমাণ আছে। খুব উচ্চশক্তিতে পার্টিকেলগুলোর বিস্ফোরণ ঘটালে স্ট্রিংগুলোর কাঠামো দেখতে পাওয়ার কথা। সমস্যা হচ্ছে, এটা দেখতে যে স্কেলের মাইক্রোস্কোপ দরকার, সেটা এখন আমাদের হাতে নেই। বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপটি ১০ -১৭ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের কোনো বস্তু দেখতে পারে। এগুলোর সাহায্যে খুদে কণিকাদের দেখা সম্ভব। কিন্তু স্ট্রিংগুলোর দৈর্ঘ্য ১০ -৩৩ সেন্টিমিটার। এই রেঞ্জে যদি কোনো মাইক্রোস্কোপ নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে স্ট্রিং দেখা সম্ভব। এখনই এই রেঞ্জের মাইক্রোস্কোপ তৈরি সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে হয়তো সম্ভব হবে। আর তখন যদি স্ট্রিং কাঠামো দেখা সম্ভব না হয়, কেবল তখনই স্ট্রিং থিওরিকে বাতিল বলা যাবে, তার আগে নয়। সে পর্যন্ত যাওয়ার আগে আমাদের কী করার আছে? হতে পারে যে আমরা আশা ছেড়ে দিই। যেদিন এমন ক্ষমতার মাইক্রোস্কোপ আমাদের হাতে আসবে, সেদিন আবার স্ট্রিং থিওরি নিয়ে গবেষণা শুরু করব। আরেকটা হতে পারে, এই ধারণার ওপর নির্ভর করেই আমাদের সেই গবেষণা অব্যাহত রাখা।

তথ্যসূত্র: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ

হাইলাইটস:

  • পদার্থবিজ্ঞান সাক্ষাৎকার বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো মানসিক শক্তি ভারতের নামী তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অশোক সেন।
  • তিনি ১৯৫৬ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।
  • ২০১৯ সালে হাই এনার্জি ফিজিকস–বিষয়ক বিশেষ এক আয়োজনে বাংলাদেশে এসেছিলেন এই বিজ্ঞানী।

আপনার আরও পছন্দ হতে পারে

একটি মন্তব্য করুন