গতকাল শুক্রবার গভীর রাতে কুমিল্লা নগরের নুরপুর এলাকায় ভিডিও থেকে নেওয়া কুমিল্লায় যুবদলকর্মী আবু কাউছারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদুল ইসলাম জনতার হাতে ধরা পড়ার পর তাঁকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। ধরা পড়ার সময় তাঁর গায়ে রক্তমাখা জামা ছিল। পুলিশ আসার আগে বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁকে কয়েক দফা মারধর করে।
গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে নগরের নুরপুর এলাকা থেকে কোতোয়ালি মডেল থানা-পুলিশ ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা তৌহিদুলকে উদ্ধার করেন। পরে তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার সংশ্লিষ্ট সূত্রকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর আত্মগোপনে ছিলেন প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদুল। নগরের নুরপুর এলাকা থেকে গতকাল রাতে তাঁকে আটক করা হয়েছে। কাউছারের জানাজা শেষে পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হবে। ওসি আরও বলেন, আটকের সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন তৌহিদুলকে মারধর করেন। ভিড় বেশি থাকায় তাঁকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের হেফাজতে নিতে বেগ পেতে হয়। তৌহিদুল এখন পুলিশের হেফাজতে আছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে আরও কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে। কুমিল্লা মহানগর যুবদলের সদস্য ও নুরপুরের বাসিন্দা মো. সোহাগ হোসেন দাবি করেছেন, তিনিই প্রথম তৌহিদুলকে শনাক্ত করেন। রাত সাড়ে তিনটার দিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রকে সোহাগ বলেন, ‘রাত ১২টার দিকে আমি বাসায় ফিরছিলাম। নুরপুর পূর্বপাড়া কাজী বাড়ির সামনে ওই ব্যক্তি (তৌহিদুল) একটি অটোরিকশা থেকে নামেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ডেন্টিস্ট বেলালের বাসা কোন দিকে। ফেসবুকে ঘটনার (কাউছারকে কুপিয়ে হত্যা) তাঁর একটা দেখেছিলাম। সেই জামাটাই তাঁর গায়ে ছিল, জামায় রক্তের দাগ তখনো লেগে ছিল। আমি মোবাইলে থাকা র সঙ্গে মিলিয়ে বললাম, আপনি তো খুনি। আপনি যেতে পারবেন না। আমি পুলিশে ফোন দিচ্ছি। তখন তিনি কোমর থেকে খঞ্জর (ছোরা) বের করে আমাকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। আমি একটু দূরে সরে গিয়ে তাঁকে ইট ছুড়ি। এর মধ্যে আমি চিৎকার করলে আশপাশের মানুষ জড়ো হয়ে তাঁকে ধরে ফেলেন।’ সোহাগ আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে তিনি দৌড়ে পাশের বাড়ির একটি মুরগির ঘরের ছাদে উঠে যান। এরপর লোকজন আরও বাড়তে থাকে। আমার সঙ্গে ঘটনার একটু পরই ডিবি পুলিশকে দেখেছি। তখন বুঝতে পারি, ডিবি পুলিশও তাঁকে ধরার কাছাকাছি ছিল।’ পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার আগে তৌহিদুলকে কয়েক দফা মারধর করেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। গতকাল শুক্রবার গভীর রাতে কুমিল্লা নগরের নুরপুর এলাকায় ভিডিও থেকে নেওয়া ভিডিওতে মারধরের দৃশ্য পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার আগে তৌহিদুলকে মারধরের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নুরপুর এলাকার একটি পুরোনো ছোট পাকা ঘরের ছাদে টিনের চালার নিচে তৌহিদুল। ছাদে ও নিচে তাঁকে ঘিরে আছেন কয়েক শ মানুষ, অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা। লোহার সিঁড়ি বেয়ে কয়েকজন ছাদে উঠে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নামানোর চেষ্টা করেন। এ সময় ডিবির সদস্যদেরও তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিতে চেষ্টা করতে দেখা যায়। ছাদের ওপর বিক্ষুব্ধ কয়েকজন তৌহিদুলকে লাথি ও কিলঘুষি মারেন। নিচে নামার পর তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁকে আবার লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। অন্য একটি ভিডিওতে তাঁকে একটি পাকা ঘরের সামনে মেঝেতে বসে থাকতে দেখা যায়। তখন তাঁর পা থেকে রক্ত ঝরছিল। দুটি ভিডিওতেই তাঁকে লুঙ্গি পরা ও খালি গায়ে দেখা গেছে। শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লা নগরের ছত্রখিল এলাকায় গোমতী নদীর উত্তর পাড়ে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আবু কাউছারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি নগরের কাপ্তান বাজার এলাকার বাসিন্দা। ঘটনায় অটোরিকশাচালক মাসুমও আহত হন।
কাউছারের ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, তাঁর বন্ধু শামীম হোসেন নদীর পাড়ে একটি জমি কিনেছিলেন। সেই জমির দখল নিয়ে শামীমের সঙ্গে তৌহিদুল ও তাঁর লোকজনের বিরোধ চলছিল। শুক্রবার সকালে মীমাংসার কথা বলে তৌহিদুল ফোন করে কাউছারকে ডেকে নেন। কাউছার, শামীমসহ কয়েকজন অটোরিকশায় সেখানে গেলে তাঁদের ওপর হামলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তৌহিদুল ও তাঁর ভাই তানজিলসহ কয়েকজন হামলা চালান। কাউছারের ঘাড়সহ শরীরের নানা স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত কাউছারের পরিবারের দাবি, আগে থেকেই হত্যার প্রস্তুতি ছিল। তৌহিদুলের হাতে দা ও অন্যদের হাতে ছুরি ছিল। হামলার পর দুটি মোটরসাইকেলে কয়েকজন সীমান্তের দিকে পালিয়ে যান।
তথ্যসূত্র: পুলিশ সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা
হাইলাইটস:
- ডিবি পুলিশের এক সদস্য লোহার সিঁড়ি বেয়ে তৌহিদুলকে নিচে নামানোর চেষ্টা করছেন।
- গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে নগরের নুরপুর এলাকা থেকে কোতোয়ালি মডেল থানা-পুলিশ ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা তৌহিদুলকে উদ্ধার করেন।
- শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার সংশ্লিষ্ট সূত্রকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।