দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের সাথে নতুন ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিপিএফ) স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই কৌশলগত অংশীদারিত্বের আওতায় বাংলাদেশকে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি নমনীয় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক।
ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার ও রাজস্ব বৃদ্ধি
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত তহবিলের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপান্তর এবং মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ঋণের শর্তাবলি সহজ রাখা হয়েছে এবং প্রায় ত্রিশ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধযোগ্য এই তহবিলের সুদের হার হবে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নদীতীর রক্ষা এবং উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষায় এই তহবিল থেকে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদে সহজ শর্তে অর্থছাড় নিশ্চিত করা হবে।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত
অর্থ উপদেষ্টা ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বৈঠকে এই ফ্রেমওয়ার্কের খসড়া নীতিমালার ওপর চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) চলমান সহায়তার সাথে এই নতুন চুক্তি জাতীয় বাজেটে বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব জানিয়েছেন, আগামী মাসে বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই ফ্রেমওয়ার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হবে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে সাম্প্রতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তা উল্লেখযোগ্যভাবে লাঘব হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বিশ্বব্যাংকের সাথে এই চুক্তি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আস্থার বার্তা পৌঁছে দেবে। এর ফলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি পাবে এবং রফতানি বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চারিত হবে। বৈদেশিক ঋণের সুষম ব্যবহার ও যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই সহযোগিতা বড় ভূমিকা রাখবে।
হাইলাইটস:
- বিশ্বব্যাংকের সাথে ৫ বছরের নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি।
- ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও জলবায়ু অবকাঠামোয় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহজ শর্তে ঋণ।
- রাজস্ব প্রশাসনের অটোমেশন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভারসাম্য ফেরানোর উদ্যোগ।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়