বাংলাদেশে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পতন ঘটাতে জাতি ঐক্যবদ্ধ হলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। স্বৈরাচার হটানোর পর অর্জিত বিজয় ধরে রাখতে না পারায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাহফুজ আনাম। তিনি দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। রাজধানীতে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনফারেন্সে তিনি এই মন্তব্য করেন। আন্তর্জাতিক এই নীতি সংলাপের আয়োজন করেছে বিশিষ্ট চিন্তক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে আন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসকদের পতন ঘটে ঠিকই। কিন্তু এরপরই রাজনৈতিক অনৈক্য ও হানাহানি আমাদের মূল অর্জনকে নস্যাৎ করে দেয়।
মাহফুজ আনাম বলেন স্বৈরাচার পতনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে পুরো জাতি এক কাতারে দাঁড়ায়। তবে স্বৈরাচার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই সেই জাতীয় ঐক্য ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। যারা একসময় রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল, ক্ষমতার লোভে তারাই আবার পরস্পরের চরম শত্রুতে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষের অমিত সম্ভাবনা ও সহনশীলতাকে আমরা কখনোই জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি না। স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরও একই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ফিরে এসেছে। স্বৈরাচার পতনের পর দেশে যে গণতান্ত্রিক পুনর্জন্মের আশা তৈরি হয়েছিল, তা কার্যকর গণতন্ত্র উপহার দিতে পারেনি।
দেশের শাসনব্যবস্থার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংস করে ফেলার কড়া সমালোচনা করেন এই জ্যেষ্ঠ সম্পাদক। তিনি বলেন যে পুলিশ বাহিনীকে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিরোধী মত দমনে নগ্নভাবে কাজে লাগানো হয়। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সাংবিধানিক সংস্থাকেও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার সংস্কৃতি থেকে দেশ বের হতে পারেনি। তিনি বলেন যে অন্ধ দলীয় আনুগত্যের কারণে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
পেশাজীবীদের নগ্ন দলীয় বিভাজনের বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন যে চিকিৎসক থেকে শুরু করে সাংবাদিক পর্যন্ত প্রতিটি পেশা আজ রাজনৈতিক আনুগত্যে বিভক্ত। নিরপেক্ষতা যেখানে সাংবাদিকতার প্রধান শক্তি, সেখানে কোনো দলের প্রকাশ্য পক্ষ নিয়ে কখনো পেশাদার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো দলের নির্বাচনে জয়লাভ করা মানেই জনগণের প্রতি তাদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রতিষ্ঠা হওয়া নয়। সরকার যখন পুরো শাসনব্যবস্থাকে নিজ দলের শাখায় পরিণত করে, তখন থেকেই প্রকৃত ধ্বংস শুরু হয়। এর প্রথম বিষময় ফল হিসেবে দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতি রাষ্ট্রকে গ্রাস করে ফেলে।
এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণে আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মাহফুজ আনাম অভিমত দেন যে প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ আমলাতন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসন থেকে দলীয় পক্ষপাত দূর করতে সহায়তা করবে। প্রশাসনকে আধুনিক ও জনবান্ধব করার মাধ্যমে আইনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। পুরো বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে, তখন আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ ও আধুনিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হবে। অন্যথায় জুলাই অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের আত্মত্যাগ আবারও বৃথা যেতে পারে বলে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দেন।
হাইলাইটস:
- স্বৈরাচার পতনের পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যর্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ মাহফুজ আনামের।
- পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর তীব্র সমালোচনা।
- বিচারহীনতা ও দুর্নীতি রুখতে আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের তাগিদ।