ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বহুল প্রতীক্ষিত ও চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। দেশটির সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্টের তত্ত্বাবধানে সারা দেশে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে। লাখ লাখ তরুণ ও বয়োবৃদ্ধ নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। কোনো বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ায় নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার প্রাথমিক ফলাফলে দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট জানিয়েছে যে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে স্বচ্ছতার সঙ্গে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে। নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি এবং আমাজন বন সংরক্ষণের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছিল। প্রেসিডেন্ট লুলা তাঁর ভাষণে দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক সমতা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছিলেন। অন্যদিকে বলসোনারো শিবির মুক্তবাজার অর্থনীতি, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং কর সংস্কারের পক্ষে জোর প্রচার চালিয়েছিল।
ব্রাজিলের এই নির্বাচন কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার ভূরাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ক্ষমতার পালাবদলে তীব্র মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে ব্রাজিলের নতুন নেতৃত্বের অর্থনৈতিক নীতি বিশ্ব বাণিজ্যকে প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে ব্রিকস জোটের সদস্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক কৌশল এই ফলাফলের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে। নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
রাজধানী ব্রাসিলিয়া, সাও পাওলো ও রিও ডি জেনিরোর মতো প্রধান প্রধান নগরীগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি প্রশাসনিক ভবনগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য এবং সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মী-সমর্থকদের শান্ত থাকার এবং সরকারি ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সমর্থকদের আনন্দ মিছিল শুরু হলেও কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলগুলো জানিয়েছে যে ভোটাররা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পেরেছেন।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান অত্যন্ত কম হতে পারে। যদি কোনো প্রার্থী সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হন, তবে নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়াতে পারে। তবে চূড়ান্ত গণনার গতি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে প্রথম ধাপেই রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ব্রাজিলের জনগণ একটি স্থিতিশীল ও গতিশীল অর্থনীতির প্রত্যাশায় নতুন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানা যাবে দেশটির পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কার হাতে ভার অর্পণ করেছে জনগণ।
হাইলাইটস:
- ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ সমাপ্ত, বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা ও বলসোনারোর মধ্যে তীব্র লড়াই।
- সম্পূর্ণ ডিজিটাল ই-ভোটিংয়ের মাধ্যমে দেশজুড়ে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট সম্পন্ন করেছে সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট।
- ব্রিকস ও দক্ষিণ আমেরিকার সার্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী এই নির্বাচন।