ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম আবারও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বারো কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে এক হাজার আটশত সাঁইত্রিশ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আজ রোববার কারওয়ান বাজারে কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নতুন এই মূল্যতালিকা ঘোষণা করা হয়। আজ সন্ধ্যা থেকেই সারা দেশে নতুন এই সমন্বিত দর অবিলম্বে কার্যকর হবে। বিগত মাসের তুলনায় সিলিন্ডার প্রতি দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নার ব্যয় আরও এক দফা বৃদ্ধি পেল। কমিশন জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে এই মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি মাসে সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের চুক্তিভিত্তিক মূল্য বা সিপি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়েছে। এছাড়া মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় টাকার বিনিময় হারের ওঠানামাও এই সমন্বয়ের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে। নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী অটোগ্যাসের দামও লিটার প্রতি আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে পাইপলাইনে সরবরাহকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম অপরিবর্তিত থাকছে। কমিশন স্পষ্ট করেছে যে, আমদানিকারক ও পরিবেশকদের নির্ধারিত লভ্যাংশ হিসাব করেই এই যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিইআরসি কর্মকর্তারা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত দরের চেয়ে এক টাকাও বেশি দামে বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট ডিলার ও পরিবেশকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা যৌথভাবে বাজারে তদারকি অভিযান জোরদার করবেন। প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে দৃশ্যমান স্থানে বিইআরসির অনুমোদিত মূল্যতালিকা টানিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদের পরিবেশক লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, নিত্যপণ্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতির মধ্যে এলপিজির দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে শহর ও গ্রামাঞ্চলের যেসব পরিবার পুরোপুরি সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকটে পড়বেন। ক্যাবের পক্ষ থেকে এলপিজি আমদানির ওপর শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের জোর দাবি জানানো হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তা দ্রুত কার্যকর করা হলেও কমার সময় তার সুফল ভোক্তারা সহজে পান না। বাজার নজরদারি আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
বিইআরসি আশ্বস্ত করেছে যে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে না পারে, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রয়েছে সরকারের। এছাড়া বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি ও বায়োগ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে ভোক্তারা নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাওয়ার অধিকার বজায় রাখতে পারবেন।
হাইলাইটস:
- ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করল বিইআরসি।
- আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর সিপি ও ডলারের বিনিময় হার বাড়ায় স্থানীয় দর সমন্বয়।
- সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশিতে বিক্রি করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারি।