Home » জুনিয়রের সঙ্গে প্রেম থেকে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই, কিরণের জীবন

জুনিয়রের সঙ্গে প্রেম থেকে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই, কিরণের জীবন

কর্তৃক Mohiuddin Mahi
০ মন্তব্য

আজ ১৪ জুন ভারতীয় বিনোদন জগতের অত্যন্ত পরিচিত ও গুণী ব্যক্তিত্ব কিরণ খেরের জন্মদিন। মিষ্টি হাসি, দাপুটে ব্যক্তিত্ব আর রুপালি পর্দায় মমতাময়ী বা রসবোধসম্পন্ন মায়ের চরিত্রে অনন্য অভিনয়ের জন্য তিনি দর্শকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। তবে তাঁর পর্দার পেছনের বাস্তব জীবনটি সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। ১৯৫২ সালের ১৪ জুন পাঞ্জাবে জন্ম নেওয়া কিরণের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চণ্ডীগড়ে, যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই নাচ, গান আর অভিনয়ে তাঁর দারুণ ঝোঁক ছিল। চণ্ডীগড়ের সেই দিনগুলোতেই তাঁর পরিচয় হয় থিয়েটারপ্রেমী এক তরুণের সঙ্গে, যিনি পরবর্তীতে বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা অনুপম খের হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে তখন কিরণ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়রের ভূমিকায় এবং অনুপম তাঁর জুনিয়র হওয়ায় তাঁদের সম্পর্কটি কেবল গভীর বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

পরবর্তীতে জীবনের এক পর্যায়ে দুজনের পথ সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। কিরণ তরুণ বয়সে ব্যবসায়ী গৌতম বেরিকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় পুত্র সিকান্দার খের, যিনি বর্তমানে একজন অভিনেতা। তবে এই দাম্পত্য জীবন সুখের না হওয়ায় একসময় তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। কাকতালীয়ভাবে, সেই একই সময়ে অনুপম খেরের বৈবাহিক জীবনেও ঝড় চলছিল। দীর্ঘদিন পর একটি নাট্যদলের সফরে আবার যখন তাঁদের দেখা হয়, তখন দুজনেই জীবনের কঠিনতম সময় পার করছিলেন। এই দুঃসময়ে পুরোনো বন্ধুই হয়ে ওঠে একে অপরের সবচেয়ে বড় মানসিক আশ্রয়, যা পরবর্তীতে ভালোবাসায় রূপ নেয়। অবশেষে অতীতকে পেছনে ফেলে ১৯৮৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ওপর ভর করে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা বলিউডের অন্যতম সফল ও স্থায়ী দম্পতি হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন।

মঞ্চনাটক দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও রূপালি পর্দায় প্রতিষ্ঠা পেতে কিরণকে বেশ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরিপক্ব বয়সে এসে তিনি যে সাফল্য পেয়েছেন, তা এক কথায় অনন্য। ‘সারদারি বেগম’ চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ প্রশংসিত হওয়ার পর, ২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘দেবদাস’ ছবিটির মাধ্যমে তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায়। শাহরুখ খান, ঐশ্বরিয়া রাই ও মাধুরীর মতো তারকাদের ভিড়েও পার্বতীর মা ‘সুমিত্রা’ চরিত্রে কিরণের দুর্দান্ত অভিনয় সমালোচক ও দর্শক মহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। এরপর থেকে বলিউডে প্রচলিত ‘মা’ চরিত্রের একঘেয়েমি ভেঙে ‘দোস্তানা’, ‘ম্যায় হুঁ না’, ‘বীর-জারা’ কিংবা ‘খুবসুরত’-এর মতো সিনেমায় কখনো কড়া শাসন, কখনো চমৎকার কমেডি টাইমিং, আবার কখনো আবেগের মিশেলে নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি ছোটপর্দায় বিভিন্ন রিয়েলিটি শো-এর বিচারক হিসেবে তাঁর স্পষ্টভাষিতা এবং রাজনীতিতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) টিকিটে চণ্ডীগড় থেকে লোকসভার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া—দুই ক্ষেত্রেই তিনি নিজের সফল অবস্থান তৈরি করেছেন।

তবে ২০২১ সালে কিরণ খেরের জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়, যখন তাঁর শরীরে রক্তের এক বিশেষ ক্যানসার ‘মাল্টিপল মায়েলোমা’ ধরা পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, কষ্টদায়ক কেমোথেরাপি আর হাসপাতালের চার দেয়ালের বন্দিজীবন তাঁকে শারীরিকভাবে দুর্বল করলেও মানসিকভাবে ভাঙতে পারেনি। এই কঠিন সময়ে ছায়ার মতো তাঁর পাশে ছিলেন স্বামী অনুপম খের, যিনি সার্বক্ষণিক তাঁর যত্ন নিয়েছেন এবং ভক্তদের কাছে প্রার্থনা চেয়েছেন। মৃত্যুভয়কে জয় করে ইতিবাচক মানসিকতার জোরে কিরণ আবার সুস্থ জীবনে ফিরে আসেন এবং জনসমক্ষে কাজ শুরু করেন, যা লাখো মানুষের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। ক্যানসারজয়ী এই লড়াইয়ের পর বয়স ও অসুস্থতার কারণে আগের চেয়ে কিছুটা দুর্বল দেখালও, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা এবং জীবনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এক অপরাজেয় পথচলাই কিরণ খেরকে অনন্য করে রেখেছে।

আপনার আরও পছন্দ হতে পারে

একটি মন্তব্য করুন