প্রবাসীদের নিরলস শ্রম এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পাওয়ায় দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে এক নতুন মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার মোট গ্রস রিজার্ভকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করেছে। এই ইতিবাচক প্রবণতা দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে ডলারের তারল্য সংকট অনেকটাই লাঘব করেছে।
বৈধ চ্যানেলে প্রণোদনা ও ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে স্বজনদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর করায় হুন্ডি চক্রের প্রভাব অনেকাংশেই কমেছে। এছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে বিদ্যমান নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক অতিরিক্ত প্রিমিয়াম সুবিধা প্রদান করায় বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আগের চেয়ে অনেক বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন। প্রবাসীদের সুবিধার্থে রেমিট্যান্স প্রেরণের ফি মওকুফসহ বিশেষ সঞ্চয় স্কিম চালু করা হয়েছে।
আমদানি দায় পরিশোধ ও মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীলতা
বৈদেশিক মুদ্রার আন্তঃপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের আমদানিকারকদের জন্য কাঁচামাল, শিল্প যন্ত্রপাতি ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা অনেক সহজ হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে ডলারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে হচ্ছে না। ফলে খোলা বাজারে ডলারের বিনিময় হার দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে একটি সুষম ও স্বাভাবিক পর্যায়ে স্থিতিশীল রূপ লাভ করেছে, যা ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
অর্থ পাচার রোধ ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তৎপরতা
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) অবৈধ হুন্ডি লেনদেন ও অর্থ পাচার প্রতিরোধে সমন্বিত প্রযুক্তিগত নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। কোনো ব্যাংক বা মানি চেঞ্জারের বিরুদ্ধে অস্বচ্ছ লেনদেনের প্রমাণ মিললে তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে রেমিট্যান্সের অর্থ কোনো বিলম্ব ছাড়াই সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকল শাখায় হেল্পডেস্ক কাজ করছে। এছাড়া প্রবাসীদের জন্য সঞ্চয়পত্র ও বিশেষ বন্ডের মুনাফার হার আকর্ষণীয় করার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগে তাদের সম্পৃক্ত করার জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিশেষ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মন্তব্য করেছেন যে, এই রেমিট্যান্সের শক্তিশালী ধারা ধরে রাখতে পারলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে গতিশীলতা তৈরি হবে। প্রবাসীদের প্রেরিত এই রেমিট্যান্স দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠনে এবং আন্তর্জাতিক ঋণমান মূল্যায়নে বাংলাদেশকে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব আহরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের এই স্থিতিশীলতা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়
হাইলাইটস:
- চলতি অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি অর্জন।
- ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের আকর্ষণীয় দর ও সরকারের প্রণোদনায় বৈধ পথে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি।
- বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট হ্রাস ও জরুরি আমদানি দায় মেটানো সহজতর।