নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশজুড়ে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ডেঙ্গু ভ্যাকসিন (টিকা) আমদানির চূড়ান্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। শুক্রবার রাজধানীতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক এক বিশেষ নীতিনির্ধারণী অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এই তথ্য নিশ্চিত করেন। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যৌথ তত্ত্বাবধানে এই ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে যাতে আগামী দিনগুলোতে মহামারী আকার ধারণকারী এই রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।
সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের উন্নত ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। রাজধানীর প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ড ও কমিউনিটি ক্লিনিকে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট এবং প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী স্যালাইন ও ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রাখা হয়েছে। তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে, মশক নিধন অভিযানের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আদায়কৃত জরিমানার অর্থ দিয়ে একটি বিশেষ কল্যাণ তহবিল গঠন করা হবে। এই তহবিলের মাধ্যমে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো প্রান্তিক ও অস্বচ্ছল পরিবারের সদস্যদের এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি ওয়ার্ডে মশক নিধনকর্মীদের কার্যক্রম তদারকি করতে আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকার ও বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যাতে মাঠপর্যায়ে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমে কোনো ধরনের শিথিলতা না থাকে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ইউনিটের জন্য ২৪ ঘণ্টা জরুরি হেল্পলাইন চালু রাখা হয়েছে যাতে গুরুতর রোগীদের দ্রুত আইসিইউ ও প্লাটিলেট সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে বর্তমানে ডেঙ্গু আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সারা বছরের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীরা চিকিৎসার বিপুল ব্যয় বহন করতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত নিরাপদ ডেঙ্গু টিকা দ্রুততম সময়ে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে মশার লার্ভা ধ্বংসে আধুনিক জৈব কীটনাশক প্রয়োগের পরিধি আরও বৃদ্ধি করার তাগিদ দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর সাথে ইতিমধ্যে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকাগুলোতে টিকাদান শুরু হবে। এর পাশাপাশি নগরবাসীকে নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আঙিনায় জমে থাকা স্বচ্ছ পানি অপসারণে সচেতন হতে বিশেষ প্রচারণামূলক অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সরকার ও সচেতন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী থাবা থেকে নগরবাসীকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া কোনো জরুরি সহায়তার জন্য সাধারণ নাগরিকরা যাতে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সার্বক্ষণিক জরুরি সেবা হটলাইনে যোগাযোগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা ও হটলাইন নম্বর প্রদর্শন করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হাইলাইটস:
- জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ডেঙ্গু টিকা আমদানির বিশেষ রূপরেখা গ্রহণ।
- হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অতিরিক্ত শয্যা ও ফ্লুইড সরবরাহের নির্দেশ।
- মশক নিধন অভিযানে সংগৃহীত জরিমানার অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সহায়তায় ব্যবহারের প্রস্তাব।